শুক্রবার, ০৪ ডিসেম্বর ২০২০, ০৮:০৯ পূর্বাহ্ন

সর্বশেষ সংবাদ:
ধামগড় ইউঃ শ্রমিক লীগের সাধাঃ সম্পাদক খোকনের মায়ের মৃত্যুতে সভাপতি মোশারফের শোক বিজয় দিবস উপলক্ষ্যে সনমান্দী ইউপি’র ৪, ৫ ও ৬নং ওয়ার্ডের সবাইকে পরি বানু’র শুভেচ্ছা ধামগড় ইউনিয়ন শ্রমিক লীগের সহ-সভাপতি হলেন গাজী আঃ কাদির ধামগড় ইউনিয়ন শ্রমিক লীগের সম্মেলন অনুষ্ঠিত// সভাপতি মোশারফ ও সম্পাদক খোকন আমরা অহিংস ও নিরস্ত্র যুদ্ধ করবো-ভিপি বাদল মেয়র হাছিনা গাজীকে ও কাউন্সিলর আতিকুর রহমানকে পুনরায় নির্বাচিত করতে মতবিনিময় সভা আব্দুল হাই ভূঁইয়া’র ৭ম মৃত্যুবার্ষিকী উপলক্ষ্যে এড. শাহাজাদা ভূঁইয়া’র গভীর শ্রদ্ধাঞ্জলি জামপুর ইউনিয়নের মাঝেরচরে শেখ রাসেল শিশু কিশোর ফুটবল টুর্নামেন্টের উদ্বোধন মদনপুর ইউনিয়ন আ’লীগের উদ্যোগে ও শেখ রুহুল আমিনের সৌজন্যে ভিপি বাদলের মাস্ক বিতরণ বন্দরের মিনারবাড়িতে বঙ্গবন্ধু পাঠাগারের সৌজন্যে ভিপি বাদলের মাস্ক বিতরণ

প্রকৃতির বুকে ঐতিহাসিক ময়নামতি শালবন বিহা্র

জান্নাতুল শাহেবাজ আয়েশা: ছোটবেলা থেকে বিভিন্ন পাঠ্য – বইয়ে ও মানুষের মুখে শুনে আসছি, বাংলাদেশের প্রাচীন সভ্যতার নিদর্শনগুলোর মধ্যে অন্যতম, ময়নামতি শালবন বিহার এর নাম।কিন্তু কোনো দিন সেখানে যাওয়ার সুযোগ হয়নি। অবশেষে ২০১৪ সালের জানুয়ারির ১ম সপ্তাহের দিকে আমি এবং আমার ২ বন্ধু মিলে চলে যাই সেই বিখ্যাত ঐতিহাসিক স্থান, শালবন বিহার, ময়নামতি কুমিল্লা তে। সেখানে গিয়ে আমি কিছু সময়ের জন্য নিজেকে হারিয়ে ফেলি, সেখানকার বহু মূল্যবান না জানা ইতিহাসের মাঝে। পুরো স্থানটি আমরা ঘুড়ে দেখলাম, বেশ বিশাল বিস্তৃত জায়গা, আর চারিদিকে অসংখ্য মাটির ঢিবি।

প্রাকৃতিক শোভায় নন্দিত কুমিল্লা জেলার এই ময়নামতি শালবন বিহার।।শালবন বিহার কুমিল্লা শহর থেকে প্রায় ৬ কি.মি দক্ষিন-পশ্চিমে ও লালমাই-ময়নামতি পাহাড়ের মধ্যবর্তী স্থানের পূর্ব দিকে অবস্থিত। জনমুখে শুনেছি, এ স্থানটিতে এককালে প্রচুর পরিমানে শাল গাছ ছিল বলে এ বিহারের নামকরণ এরূপ হয়েছে। ময়নামতির শালবন বিহারে খনন করে একটি বৌদ্ধবিহার ও অন্যান্য উপকরণ আবিষ্কৃত হয়েছে। কেন্দ্রে একটি মন্দির এবং তার চতুর্দিকে ক্রুশ আকারে চারটি শাখায় এ বিহারের পরিকল্পনা করা হয়।এর উত্তর শাখায় মধ্যবর্তী স্থানে একটি মাত্র প্রবেশ পথ আর এর সম্মুখ ভাগে ২২.৬ মিটার চওড়া। প্রবেশ পথের দু’পাশে আছে দুটি প্রহরি কক্ষ। বিহারটি দেখতে ইটে নির্মিত বিরাট আকৃতির। এটি প্রাচীর বেষ্টিত এবং এর পিছনের প্রাচীর ৫ মিটার প্রশস্ত। এ বিহারের বেষ্টনী প্রাচীর প্রহরীকক্ষ সংবলিত একটিমাত্র প্রবেশপথ ইত্যাদি নানান বৈশিষ্ট্য থেকে জানতে পারি যে, বহিঃশত্রুর আক্রমণ থেকে রক্ষা পাওয়ার জন্য বিহারটি ছিল সুরক্ষা ব্যবস্থা সংবলিত দুর্গের ন্যায়। এ বর্গাকার বৌদ্ধ বিহারের একেক বাহু ১৬৭ মিটার দীর্ঘ আর এতে ভিক্ষুদের বসবাসের জিন্য মোট ১৫৫ টি কক্ষ আছে। কক্ষগুলোর পরিমাপ ৩.৬৬মিটার x ৩.৬৬ মিটার এবং ১.৫ মিটার প্রশস্ত দেয়াল দ্বারা একটি থেকে অন্যটি আলাদা করা। চারিদিক পরিদর্শনের পর লক্ষ্য করে দেখলাম, প্রতিটি কক্ষে তিনটি করে কুলুঙ্গি, একটি করে প্রবেশ পথ এবং সামনে ২.৫ মিটার প্রশস্ত টানা বারান্দা। শালবন বিহারের পর আসি ইটখোলা মুড়ায়। এটি শালবন বিহার থেকে প্রায় ২ কি.মি উত্তর-পশ্চিমে কোটবাড়ীতে অবস্থিত। চারদিকের ভূমি থেকে প্রায় ২০.৫ মি. উচ্চতা বিশিষ্ট ঢিবির উপরে ইটখোলা মুড়ার ধ্বংসাবশেষ পাওয়া গেছে। এর প্রায় ৫০ মি.দক্ষিনে একটি মন্দির আছে। ইটখোলা মুড়ার বিহারের চারদিকের বেষ্টনী বাহুতে এক সারি করে ভিক্ষু কোঠা এবং মাঝে রয়েছে উন্মুক্ত চত্বর। মন্দির ও বিহারের অবস্থান পূর্বমুখী বহিঃপ্রাচীরের প্রত্যেক বাহুর দৈর্ঘ্য প্রায় ১৩৭.১৬ মিটার। ইটখোলা মুড়া থেকে আবিষ্কৃত উল্লেখযোগ্য প্রত্নবস্তুর মধ্যে রয়েছে চুন বালি জাত উপকরণের তৈরী একটি বড় আকারের লোকত্তর বুদ্ধ (ঊপরের অবাক্ষ অংশ নেই) মূর্তি, তিনটি সোনার পিন্ড, একটি রূপার মুদ্রা, কিছু সংখ্যক ধাতু মূর্তি ও একটি তাম্রশাসন। পুরা বস্তুগুলোর বৈশিষ্ট্যের উপর ভিত্তি করে জানা যায় এগুলোর নির্মাণকাল খ্রিষ্টীয় অষ্টম থেকে নবম শতক পর্যন্ত।

এরপর আসলাম কুটিল মুড়ার কাছে। এ কুটি্লা মুড়ার ভিত্তি মঞ্চের উপরে পরপর দণ্ডায়মান তিনটি স্তূপ রয়েছে। বলা হয়ে থাকে, এ তিনটি স্তূপ সম্ভবত বৌদ্ধ ধর্মের ‘ত্রিরত্ন’ অর্থাৎ বুদ্ধ(জ্ঞান), ধর্ম (ন্যায়)এবং সংঘ (শৃঙ্খলা)এ তিনের প্রতীক। বৈচিত্রময় উল্লেখযোগ্য স্থাপত্যরীতির প্রতিনিধিত্ব করছে কুটিলা মুড়া; এক সারিতে ৩ টি স্তূপ, প্রত্যেকটির সামনে ছিল একটি করে চৈত্য। এ কুটিলা মুড়ার স্থাপনাগুলোর নির্মাণ কাল খ্রিষ্টীয় সপ্তম শতক বলে ধারণা করা হয় এবং এগুলো সম্ভবত তের শতক পর্যন্ত টিকে ছিল। কুটিলা মুড়া থেকে ২ কি.মি উত্তর-পশ্চিমে একটি সমতল পাহাড়ের চূড়ায় চারপত্র মুড়ার স্থাপনা এবং দক্ষিণে লালমাই ময়নামতি পাহাড়ের পূর্ব প্রান্তের উত্তর দিকে কুমিল্লা সেনানিবাসের ভিতরে আনন্দ বিহার অবস্থিত। চারপত্র মুড়া থেকে প্রায় ২.৫ কি.মি উত্তরে টিপারা বাজার সংলগ্ন পশ্চিমে অবস্থিত ৮ মিটার উঁচু টিলার উপর ময়নামতি ঢিবি দেখতে পেলাম। এখানে স্থাপত্যিক নিদর্শন এর মধ্যে ৬টি বিচ্ছিন্ন দেয়াল ও দুটি মেঝে উল্লেখযোগ্য। বর্তমানে যে ধ্বংসাবশেষ আছে, তার ওপর ভিত্তি করে স্থাপনাটিকে একাধিক দেয়াল পরিবেষ্টিত তোরণ সংবলিত একটি সুরক্ষিত দুর্গ বলে মনে করা হয়।

প্রতিটি জায়গাই ঘুড়ে ঘুড়ে দেখতে পেলাম বিভিন্ন ধ্বংসাবশেষ, যেগুলো কিছু সময়ের জন্য নিয়ে যায় অতীত ইতিহাসের জগতে।এছাড়াও এখানে রয়েছে ময়নামতি জাদুঘর, লালমাই পাহাড়, ময়নামতি ওয়্যার সিমেট্রি, সেনানিবাস জাদুঘর ইত্যাদি। কিন্তু অতি দুঃখের সাথে বলতে হচ্ছে, এসব ধ্বংসাবশেষ রক্ষা করার কোনো চেষ্টাই গৃহীত হচ্ছে না, যার কারণে আজ এই ঐতিহাসিক স্থানটি তার অস্তিত্ব প্রায় হারাতে বসেছে। সঠিক পরিচালনা ও ব্যবস্থাপনার তীব্র অভাব লক্ষ্য করেছি।গত কয়েক দশক ধরে কুমিল্লা ক্যান্টনমেন্ট এর সম্প্রসারণ ও নতুন স্থাপনা নির্মাণের ফলে এ ঐতিহাসিক স্থানটির পরিধি ক্রমশ ছোট হয়ে চলেছে এবং মাটির নিচে চাপা পড়া পুরাকীর্তি গুলো বেশ ক্ষতিগ্রস্থ হয়েছে। সরকার যদি সঠিক সময়ে এর পদক্ষেপ না নেয় তাহলে একসময় অতলে হারিয়ে যাবে বাংলাদেশ এর এই মহান ঐতিহাসিক ধ্বংসাবশেষ প্রদর্শন স্থান, ময়নামতি শালবন বিহার।

ঈদে বা অন্য যেকোনো ছুটির দিনে আপনার সময়কে আনন্দময় করে তোলার জন্য ঘুড়ে আসতে পারেন প্রকৃতির বুকে ঐতিহ্যধারণ করা, এই কুমিল্লা নগরীতে। ঢাকা সায়দাবাদ থেকে একাধিক বাস ছেড়ে যায় কুমিল্লার স্টেশন শাসনগাছার উদ্দেশ্যে। ভাড়া প্রায় ১১০-১৩০ টাকা। তারপর আপনি সহজেই সেখান থেকে যেতে পারবেন এইসব জায়গা দেখতে। ভ্রমণ শেষ এ বাড়ি ফেরার পথে অবশ্যই প্রিয়জনের জন্য ঐতিহ্যবাহী রসমালাই এবং খদ্দরের পোশাক নিয়ে যাবেন।

নিউজটি শেয়ার করুন:

আপনার মতামত কমেন্টস করুন


© All rights reserved © 2019 Newsnarayanganj71
Design & Developed BY N Host BD